পর্যটকদের কাছে টানছে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
১৪ জুন, ২০২৫, 5:29 PM
পর্যটকদের কাছে টানছে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর
বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে পর্যটকরা ছুটে আসছেন টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে। জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর। হাওরের নীলজলরাশি, নীল আকাশ আরও হাওরটির উত্তর পাশে মেঘালয় পাহাড় সবুজআভা মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। রাতে জ্যোৎস্নার আলো আর হিমেল হাওয়া এযেন এক স্বর্গসুখের অনুভূতি। এমন মনোরম দৃশ্য মানবজীবনকে সার্থক করে তুলে। মন চায় হাওরের বুকে হারিয়ে যেতে।
টাঙ্গুয়ার হাওর নিলাদ্রী লেক, বারেকের টিলা, শিমুল বাগানকে ঘিরে কমপক্ষে হাউজবোটসহ ২ শতাধিক বোট চলাচল করলেও জেলা প্রশাসন থেকে ৯০টি হাউজবোট নিবন্ধন নিয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর :
১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ সালে জানুয়ারিতে এ হাওরকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় কাজ করে আইসিইউএন। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। সুইস অ্যাজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) এবং আইসিইউএন ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা' প্রকল্প পরিচালনা করে।
প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট।
বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় হয়ে দাড়ায়। বর্ষায় আকাশ, মেঘালয় পাড়া আর হাওরের জল ত্রিমুখি সৌন্দের্যের মেলবন্ধেনে অপরূপ দেখায় হাওরটিকে। পুর্নিমা রাতে এ হাওরে জ্যোৎস্না উৎসব হয়।
গত ৫ বছরে বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে শতাধিক বিলাশ বহুল হাউজ বোট সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুর থেকে পর্যটকদের নিয়ে চষে বেড়ায়। হাউজ বোটগুলো এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় ভাড়া নেয় (দুইদিন ও এক রাতের জন্য)। সকালে সুনামগঞ্জ অথবা তাহিরপুর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার, টেকেরঘাট, নিলাদ্রী লেক, শিমুল বাগান ঘুরে পরদিন সুনামগঞ্জ অথবা তাহিরপুর এসে পৌঁছে।
এছাড়াও মৌসুম ভেদে এ জেলার প্রকৃতি তিনটি রূপ ধারণ করে। যেমন, বর্ষা মৌসুমে বিশাল বিশাল হাওরের নীল জলরাশি আর আকাশের নীলাভ খেলা। হাওরের এ পাশ থেকে থাকালে মনে হয় অপাশে যেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। আবার হেমন্তে মানে শীতকালে (পৌষ ও মাঘ মাসে) হাওরের সবুজ বুকে নীল আকাশের নীল আর সবুজের মিতালী এবং ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে হাওর জুড়ে সোনায় মোড়ানো (সোনালী ধান) এযেন রং তুলিকে হার মানানো ছবি। চর্তুদিকে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে মনে ভরে উঠে। এ দৃশ্যগুলো অবশ্যই উপভোগ্য। এমন মনোরম দৃশ্য মানবজীবনকে সার্থক করে তুলে। মন চায় হাওরের সোনালী বুকে হারিয়ে যেতে।
গত মঙ্গলবার জেলার তাহিরপুর উপজেলার এশিয়ার বৃহত্তম শিমুলবাগা গিয়ে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি পর্যটকবাহী হাউজবোট।
এসময় জমিদার নামের এক হাউজবোটে পল্লীবাংলার সাথে কথা হয় পর্যটক মো. আজমল হোসেনের। আজমল জানান, তিনি একটি সনামধন্য কুরিয়ারের ঢাকা অফিসের সার্ভিস ম্যানেজার। সোমবার সকালে সুনামগঞ্জ ওয়েজখালিতে এসে জমিদার নামক হাউজবোটে ওঠেন। সকাল ৮ টায় অন্যান্য পর্যটকদের নিয়ে হাউজবোটটি টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সোমবার সারাদিন টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় হাউজবোট থাকে। সেখানে তিনিসহ জমিদার হাউজবোটের পর্যটকরা হাওরের নীলজল, সারি সারি হিজল-করচ হাছ আর নীলাভ মেঘালয় পাহাড়। এ যেন হাওর পাহাড়ের এক মেলবন্ধন তৈরি করে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা বলে জানান পর্যটক আজমল।
এ হাউজবোটের অপর পর্যটক রনি ভুইঁয়া পল্লীবাংলাকে জানান, তারা ৩ বন্ধু এসেছেন টাঙ্গুয়ার হাওরসহ নিলাদ্রী লেক, বারেকের টিলা, শিমুল বাগান ঘুরে দেখতে। খুব ভাল লাগছে। তবে এসব এলাকায় হিজড়া উৎপাত করে। এছাড়াও এসব স্পটে ড্রেস চেঞ্জ ও শৌচাগারের অভাব রয়েছে বলেও জানান পর্যটক রনি ভূইঁয়া।
রাজু নামে এক পর্যটক জানান, এ পর্যটন স্পটগুলোতে মোটরসাইকেল, অটোরিক্সার ভাড়া নির্ধারণ করা নেই। ফলে এক এক সময় এক এক ভাড়া চায় এসব যানবাহনের চালকরা। শুধু তাই নয় তাদের নেই কোন ড্রেস। ড্রেস থাকলে চেনা যেত কারা পর্যটকদের পরিবহন করেন। এছাড়াও এক স্পট থেকে অন্য স্পটে যাওয়ার রাস্তা অত্যন্ত খারাপ।
জামিদার হাউজবোটে ম্যানেজার হৃদয় মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, তার হাউজবোটে ৯টি কেবিন রয়েছে। ৪ জনের ২টি কেবিন, ৩ জনের ৪টি কেবিন ও ২ জনের ৩ টা কেবিন রয়েছে। এছাড়াও হাউজবোটের লবি রয়েছে। লবিতে দুটি খাটে ৬ জন পর্যটক থাকতে পারেন।
হৃদয় আরও জানান, ৪ জনের কেবিন ভাড়া (২দিন ও এক রাত) ২০ হাজার টাকা, ৩জনের কেবিন ভাড়া ১৮ হাজার টাকা ও ২ জনের কেবিন ১৩ হাজার টাকা এবং লবির ভাড়া জন প্রতি ৫ হাজার টাকা।
তিনি জানান, এ ভাড়ার মধ্যে সকালের নাস্তা ডিম খিচুরি, দুপুরে মাছ, মুরগি ও ভাত, রাতে ভাল মাছ ও মাছে ভর্তা ও এবং ডাল-সবজি ইত্যাদি খাবার ফ্রি দেয়া হয়। তার হাউজবোটে ৭ জন স্টাফ রয়েছেন।
নীল জল হাউজবোটের ম্যানেজার আল আবির পল্লীবাংলাকে জানান, তার হাউজবোটে ৭টি কেবিন রয়েছে। তার হাউজবোটে ৭ জন স্টাফ রয়েছেন।
আবির আরও জানান, নীলজল হাউজবোটে সকালে নাস্তা দেয়া হয় ডিম খিচুরি, দুপুরের খাবারে দেয়া হয় ভাত, হাঁসের মাংস, সবজি ডাল ও রাতের খাবরে দেয়া হয় মাছ, মাছের ভর্তা ও সবজি-ডাল।
তাহিরপুর উপজেলা নৌ পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মো. রব্বানী পল্লীবাংলাকে জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় থানা পুলিশের পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিজিবি ও টাঙ্গুয়ার হাওরের নিয়োজিত আনসার বাহিনী রয়েছে। এছাড়াও রাতে হাউজবোটে পর্যটকরা ঘুমিয়ে পড়লে বোটগুলোর স্টাফরা প্রহরীর কাজ করে।
বাগানের ম্যানেজার উজ্জল মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের ঘুরতে আসা পর্যটকরা শিমুল বাগান দেখেতে ভুল করেন না। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫শ পর্যটক আসছেন। শুক্র ও শনিবার ৫শ থেকে ৭শ পর্যটক আসেন শিমুল বাগনে। সিজনে অর্থাৎ যখন শিমুল ফুল ফুটে (১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) তখন আরও বেশি পর্যটক শিমুল বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি’র) নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন পল্লীবাংলাকে জানান, শিমুল বাগান, বারেকেরটিলা, নিলাদ্রী লেক, টেকেরঘাট সড়কে কাজ ৩০ ভাগ হয়েছে। এক বছরের মধ্যে এ সড়কটির কাজ শেষ হবে বলেও জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, জেলায় পর্যটনের বিকাশে জেলা প্রশাসন নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০টি হাউজবোট নিবন্ধন করেছে। অন্যান্য হাউজবোটগুলোকেও নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, টেকেরঘাট এলাকায় পর্যটকদের জন্য আধুনিক ওয়াশব্লক নির্মাণ করার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই বাস্তবায়ন করা হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে হাউজবোটভিত্তিক পর্যটন শিল্প গড়ে উঠায় সকল হাউজবোটকে রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। সকল হাউজবোটে প্রশিক্ষিত গাইড দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য টেকেরঘাটে নির্মাণ করা হবে বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন।
এছাড়াও পর্যটন এলাকায় চলাচলরত মোটরসাইকেল, অটোরিক্সা এবং স্পীডবোট চালককে রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় এনে নির্দিষ্ট পোশাক নির্ধারণ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার্থে ওয়াচ টাওয়ার কাম টাঙ্গুয়ার হাওর ম্যানেজমেন্ট অফিস নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, বারেকের টিলায় মুনভিউ পয়েন্ট নির্মাণ করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও হাওরপারের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে চালু করা হবে ভাসমান বাজার।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
১৪ জুন, ২০২৫, 5:29 PM
বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে পর্যটকরা ছুটে আসছেন টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে। জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর। হাওরের নীলজলরাশি, নীল আকাশ আরও হাওরটির উত্তর পাশে মেঘালয় পাহাড় সবুজআভা মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। রাতে জ্যোৎস্নার আলো আর হিমেল হাওয়া এযেন এক স্বর্গসুখের অনুভূতি। এমন মনোরম দৃশ্য মানবজীবনকে সার্থক করে তুলে। মন চায় হাওরের বুকে হারিয়ে যেতে।
টাঙ্গুয়ার হাওর নিলাদ্রী লেক, বারেকের টিলা, শিমুল বাগানকে ঘিরে কমপক্ষে হাউজবোটসহ ২ শতাধিক বোট চলাচল করলেও জেলা প্রশাসন থেকে ৯০টি হাউজবোট নিবন্ধন নিয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর :
১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ সালে জানুয়ারিতে এ হাওরকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষায় কাজ করে আইসিইউএন। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। সুইস অ্যাজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) এবং আইসিইউএন ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা' প্রকল্প পরিচালনা করে।
প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট।
বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় হয়ে দাড়ায়। বর্ষায় আকাশ, মেঘালয় পাড়া আর হাওরের জল ত্রিমুখি সৌন্দের্যের মেলবন্ধেনে অপরূপ দেখায় হাওরটিকে। পুর্নিমা রাতে এ হাওরে জ্যোৎস্না উৎসব হয়।
গত ৫ বছরে বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে শতাধিক বিলাশ বহুল হাউজ বোট সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুর থেকে পর্যটকদের নিয়ে চষে বেড়ায়। হাউজ বোটগুলো এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় ভাড়া নেয় (দুইদিন ও এক রাতের জন্য)। সকালে সুনামগঞ্জ অথবা তাহিরপুর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার, টেকেরঘাট, নিলাদ্রী লেক, শিমুল বাগান ঘুরে পরদিন সুনামগঞ্জ অথবা তাহিরপুর এসে পৌঁছে।
এছাড়াও মৌসুম ভেদে এ জেলার প্রকৃতি তিনটি রূপ ধারণ করে। যেমন, বর্ষা মৌসুমে বিশাল বিশাল হাওরের নীল জলরাশি আর আকাশের নীলাভ খেলা। হাওরের এ পাশ থেকে থাকালে মনে হয় অপাশে যেন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। আবার হেমন্তে মানে শীতকালে (পৌষ ও মাঘ মাসে) হাওরের সবুজ বুকে নীল আকাশের নীল আর সবুজের মিতালী এবং ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে হাওর জুড়ে সোনায় মোড়ানো (সোনালী ধান) এযেন রং তুলিকে হার মানানো ছবি। চর্তুদিকে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে মনে ভরে উঠে। এ দৃশ্যগুলো অবশ্যই উপভোগ্য। এমন মনোরম দৃশ্য মানবজীবনকে সার্থক করে তুলে। মন চায় হাওরের সোনালী বুকে হারিয়ে যেতে।
গত মঙ্গলবার জেলার তাহিরপুর উপজেলার এশিয়ার বৃহত্তম শিমুলবাগা গিয়ে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি পর্যটকবাহী হাউজবোট।
এসময় জমিদার নামের এক হাউজবোটে পল্লীবাংলার সাথে কথা হয় পর্যটক মো. আজমল হোসেনের। আজমল জানান, তিনি একটি সনামধন্য কুরিয়ারের ঢাকা অফিসের সার্ভিস ম্যানেজার। সোমবার সকালে সুনামগঞ্জ ওয়েজখালিতে এসে জমিদার নামক হাউজবোটে ওঠেন। সকাল ৮ টায় অন্যান্য পর্যটকদের নিয়ে হাউজবোটটি টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সোমবার সারাদিন টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় হাউজবোট থাকে। সেখানে তিনিসহ জমিদার হাউজবোটের পর্যটকরা হাওরের নীলজল, সারি সারি হিজল-করচ হাছ আর নীলাভ মেঘালয় পাহাড়। এ যেন হাওর পাহাড়ের এক মেলবন্ধন তৈরি করে দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা বলে জানান পর্যটক আজমল।
এ হাউজবোটের অপর পর্যটক রনি ভুইঁয়া পল্লীবাংলাকে জানান, তারা ৩ বন্ধু এসেছেন টাঙ্গুয়ার হাওরসহ নিলাদ্রী লেক, বারেকের টিলা, শিমুল বাগান ঘুরে দেখতে। খুব ভাল লাগছে। তবে এসব এলাকায় হিজড়া উৎপাত করে। এছাড়াও এসব স্পটে ড্রেস চেঞ্জ ও শৌচাগারের অভাব রয়েছে বলেও জানান পর্যটক রনি ভূইঁয়া।
রাজু নামে এক পর্যটক জানান, এ পর্যটন স্পটগুলোতে মোটরসাইকেল, অটোরিক্সার ভাড়া নির্ধারণ করা নেই। ফলে এক এক সময় এক এক ভাড়া চায় এসব যানবাহনের চালকরা। শুধু তাই নয় তাদের নেই কোন ড্রেস। ড্রেস থাকলে চেনা যেত কারা পর্যটকদের পরিবহন করেন। এছাড়াও এক স্পট থেকে অন্য স্পটে যাওয়ার রাস্তা অত্যন্ত খারাপ।
জামিদার হাউজবোটে ম্যানেজার হৃদয় মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, তার হাউজবোটে ৯টি কেবিন রয়েছে। ৪ জনের ২টি কেবিন, ৩ জনের ৪টি কেবিন ও ২ জনের ৩ টা কেবিন রয়েছে। এছাড়াও হাউজবোটের লবি রয়েছে। লবিতে দুটি খাটে ৬ জন পর্যটক থাকতে পারেন।
হৃদয় আরও জানান, ৪ জনের কেবিন ভাড়া (২দিন ও এক রাত) ২০ হাজার টাকা, ৩জনের কেবিন ভাড়া ১৮ হাজার টাকা ও ২ জনের কেবিন ১৩ হাজার টাকা এবং লবির ভাড়া জন প্রতি ৫ হাজার টাকা।
তিনি জানান, এ ভাড়ার মধ্যে সকালের নাস্তা ডিম খিচুরি, দুপুরে মাছ, মুরগি ও ভাত, রাতে ভাল মাছ ও মাছে ভর্তা ও এবং ডাল-সবজি ইত্যাদি খাবার ফ্রি দেয়া হয়। তার হাউজবোটে ৭ জন স্টাফ রয়েছেন।
নীল জল হাউজবোটের ম্যানেজার আল আবির পল্লীবাংলাকে জানান, তার হাউজবোটে ৭টি কেবিন রয়েছে। তার হাউজবোটে ৭ জন স্টাফ রয়েছেন।
আবির আরও জানান, নীলজল হাউজবোটে সকালে নাস্তা দেয়া হয় ডিম খিচুরি, দুপুরের খাবারে দেয়া হয় ভাত, হাঁসের মাংস, সবজি ডাল ও রাতের খাবরে দেয়া হয় মাছ, মাছের ভর্তা ও সবজি-ডাল।
তাহিরপুর উপজেলা নৌ পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মো. রব্বানী পল্লীবাংলাকে জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় থানা পুলিশের পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিজিবি ও টাঙ্গুয়ার হাওরের নিয়োজিত আনসার বাহিনী রয়েছে। এছাড়াও রাতে হাউজবোটে পর্যটকরা ঘুমিয়ে পড়লে বোটগুলোর স্টাফরা প্রহরীর কাজ করে।
বাগানের ম্যানেজার উজ্জল মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের ঘুরতে আসা পর্যটকরা শিমুল বাগান দেখেতে ভুল করেন না। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫শ পর্যটক আসছেন। শুক্র ও শনিবার ৫শ থেকে ৭শ পর্যটক আসেন শিমুল বাগনে। সিজনে অর্থাৎ যখন শিমুল ফুল ফুটে (১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) তখন আরও বেশি পর্যটক শিমুল বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি’র) নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন পল্লীবাংলাকে জানান, শিমুল বাগান, বারেকেরটিলা, নিলাদ্রী লেক, টেকেরঘাট সড়কে কাজ ৩০ ভাগ হয়েছে। এক বছরের মধ্যে এ সড়কটির কাজ শেষ হবে বলেও জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া পল্লীবাংলাকে জানান, জেলায় পর্যটনের বিকাশে জেলা প্রশাসন নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০টি হাউজবোট নিবন্ধন করেছে। অন্যান্য হাউজবোটগুলোকেও নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, টেকেরঘাট এলাকায় পর্যটকদের জন্য আধুনিক ওয়াশব্লক নির্মাণ করার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই বাস্তবায়ন করা হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে হাউজবোটভিত্তিক পর্যটন শিল্প গড়ে উঠায় সকল হাউজবোটকে রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। সকল হাউজবোটে প্রশিক্ষিত গাইড দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য টেকেরঘাটে নির্মাণ করা হবে বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন।
এছাড়াও পর্যটন এলাকায় চলাচলরত মোটরসাইকেল, অটোরিক্সা এবং স্পীডবোট চালককে রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় এনে নির্দিষ্ট পোশাক নির্ধারণ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার্থে ওয়াচ টাওয়ার কাম টাঙ্গুয়ার হাওর ম্যানেজমেন্ট অফিস নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক আরো জানান, বারেকের টিলায় মুনভিউ পয়েন্ট নির্মাণ করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও হাওরপারের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে চালু করা হবে ভাসমান বাজার।