নাব্য সংকটে স্থবির ফরিদপুরের সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দর
বিপুল চন্দ, ফরিদপুর প্রতিনিধি :
০৮ মার্চ, ২০২৬, 6:51 PM
নাব্য সংকটে স্থবির ফরিদপুরের সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দর
পদ্মা নদীতে নাব্য সংকটের কারণে শুষ্ক মৌসুমে টানা তিন মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দর। দীর্ঘ এক যুগ ধরে একই সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, মাত্র তিন কিলোমিটার নদীপথ পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করলেই সংকট দূর করা সম্ভব। কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে প্রতিবছরই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত শত বছরের পুরোনো এই ঘাটটি ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে শুষ্ক মৌসুম এলেই ঘাট থেকে ভাটির দিকে প্রায় তিন কিলোমিটার অংশে চ্যানেল ভরাট হয়ে ডুবোচর সৃষ্টি হয়। ফলে বড় কার্গো, ট্রলার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পণ্যবাহী নৌযান ভিড়তে না পারায় নৌবন্দরের শুল্ক আদায়ও বন্ধ রয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজের মালিক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। একই সঙ্গে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা। অনেক জাহাজকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মাঝ পদ্মা নদীতে অরক্ষিত অবস্থায় নোঙর করে রাখতে হচ্ছে।
ডুবোচর ও পানির স্বল্পতার কারণে দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা অনেক জাহাজ পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ছে। ফলে বন্দরে ভিড়তে না পেরে মাঝনদীতেই অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে হাজারের বেশি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।
বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হলেও শুষ্ক মৌসুমে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই নৌবন্দর দিয়ে ফরিদপুরের বিখ্যাত সোনালি আঁশ পাট চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। এছাড়া সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্ট এবং চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মিরকাদিম থেকে চাল এই নৌপথে ফরিদপুরে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নৌযান মালিক অভিযোগ করেন, একসঙ্গে কয়েকটি ড্রেজার বসিয়ে চ্যানেল খনন করা হলে দ্রুত নৌবন্দর সচল করা সম্ভব। তবে সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি মহলের প্রভাবের কারণে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলম শেখ বলেন, “একটি ড্রেজার দিয়ে নামমাত্র ড্রেজিং করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেখানে বালু জমে যাচ্ছে। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং নৌযান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।”
বর্তমান ঘাট ইজারাদার মজিবুর রহমান জানান, প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিনি। গত তিন মাসে বিআইডব্লিউটিএকে ২৫টি চিঠি দেওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্নাবালা বলেন, পরিকল্পিতভাবে একসঙ্গে কয়েকটি ড্রেজার বসিয়ে গভীর চ্যানেল কাটা হলে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হবে। এরপর প্রতিবছর ওই চ্যানেলটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
বিআইডব্লিউটিএ ফরিদপুরের পোর্ট অফিসার পলাশ রায় বলেন, ড্রেজারের স্বল্পতা ও সমন্বয়ের অভাবে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত ড্রেজার চাওয়া হয়েছে, সেগুলো এলেই খনন কাজ শুরু করা হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, নাব্য সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ড্রেজিং করে নদীপথ সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরটি শত বছরের পুরোনো। ২০১৫ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর ঘোষণা করা হয় এবং পরে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়।
বিপুল চন্দ, ফরিদপুর প্রতিনিধি :
০৮ মার্চ, ২০২৬, 6:51 PM
পদ্মা নদীতে নাব্য সংকটের কারণে শুষ্ক মৌসুমে টানা তিন মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দর। দীর্ঘ এক যুগ ধরে একই সমস্যা চললেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, মাত্র তিন কিলোমিটার নদীপথ পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করলেই সংকট দূর করা সম্ভব। কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে প্রতিবছরই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত শত বছরের পুরোনো এই ঘাটটি ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে শুষ্ক মৌসুম এলেই ঘাট থেকে ভাটির দিকে প্রায় তিন কিলোমিটার অংশে চ্যানেল ভরাট হয়ে ডুবোচর সৃষ্টি হয়। ফলে বড় কার্গো, ট্রলার ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পণ্যবাহী নৌযান ভিড়তে না পারায় নৌবন্দরের শুল্ক আদায়ও বন্ধ রয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজের মালিক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। একই সঙ্গে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা। অনেক জাহাজকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মাঝ পদ্মা নদীতে অরক্ষিত অবস্থায় নোঙর করে রাখতে হচ্ছে।
ডুবোচর ও পানির স্বল্পতার কারণে দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা অনেক জাহাজ পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ছে। ফলে বন্দরে ভিড়তে না পেরে মাঝনদীতেই অবস্থান করতে হচ্ছে। এতে হাজারের বেশি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।
বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হলেও শুষ্ক মৌসুমে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই নৌবন্দর দিয়ে ফরিদপুরের বিখ্যাত সোনালি আঁশ পাট চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। এছাড়া সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্ট এবং চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মিরকাদিম থেকে চাল এই নৌপথে ফরিদপুরে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নৌযান মালিক অভিযোগ করেন, একসঙ্গে কয়েকটি ড্রেজার বসিয়ে চ্যানেল খনন করা হলে দ্রুত নৌবন্দর সচল করা সম্ভব। তবে সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি মহলের প্রভাবের কারণে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আলম শেখ বলেন, “একটি ড্রেজার দিয়ে নামমাত্র ড্রেজিং করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেখানে বালু জমে যাচ্ছে। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং নৌযান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।”
বর্তমান ঘাট ইজারাদার মজিবুর রহমান জানান, প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিনি। গত তিন মাসে বিআইডব্লিউটিএকে ২৫টি চিঠি দেওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্নাবালা বলেন, পরিকল্পিতভাবে একসঙ্গে কয়েকটি ড্রেজার বসিয়ে গভীর চ্যানেল কাটা হলে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হবে। এরপর প্রতিবছর ওই চ্যানেলটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
বিআইডব্লিউটিএ ফরিদপুরের পোর্ট অফিসার পলাশ রায় বলেন, ড্রেজারের স্বল্পতা ও সমন্বয়ের অভাবে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত ড্রেজার চাওয়া হয়েছে, সেগুলো এলেই খনন কাজ শুরু করা হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, নাব্য সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ড্রেজিং করে নদীপথ সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরটি শত বছরের পুরোনো। ২০১৫ সালে এটিকে পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর ঘোষণা করা হয় এবং পরে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়।
সম্পর্কিত