শিক্ষানুরাগী বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের দানে প্রাণ পায় হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ
এস এম শামীম আহমেদ :
০৯ মে, ২০২৬, 8:49 PM
শিক্ষানুরাগী বৃন্দাবন চন্দ্র দাসের দানে প্রাণ পায় হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ
দরিদ্র কৃষকের সন্তান হয়েও শিক্ষার আলো ছড়াতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন বৃন্দাবন চন্দ্র দাস। তাঁর এককালীন ১০ হাজার টাকা দানেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম থেকে বেঁচে যায় হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বৃন্দাবন সরকারি কলেজ।
বৃন্দাবন চন্দ্র দাস ১৮৫০ সালের ভাদ্র মাসে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বিথঙ্গল গ্রামের বড় আখড়া সংলগ্ন পশ্চিমের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিষ্ণু চন্দ্র দাস ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক, মা মহামায়া দাস। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তৎকালীন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হলেও পেশায় তিনি ছিলেন মিরাশদার, মহাজন, মহালদার ও সফল ব্যবসায়ী। চিত্তরঞ্জন কটন মিলস ও অল ইন্ডিয়া সুগার মিলস লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ভাদ্র মাসে মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র ও দুই কন্যা রেখে যান।
জমিদারি থাকলেও তিনি সাধারণ কৃষকের মতো জীবনযাপন করতেন। গরিবের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম সেবামূলক মনোভাব। অত্যাচারী জমিদার ও ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতার প্রমাণ তাঁর জীবনীতে মেলে। ব্রিটিশ সরকার ‘চৌধুরী’, ‘রায় সাহেব’ ও ‘ব্যাংকার্স’ উপাধি দিলেও তিনি কখনো নিজ নামের সঙ্গে তা যুক্ত করেননি। নিলামে জমিদারদের নিষ্পত্তি জমি কিনে তিনি ৫৬টি তালুকের মালিক হন।
১৯১৩ সালে কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি মনোহর বাজারে বাঁশের ঘর ও ছোট একটি পাকা ঘর নিয়ে ‘হবিগঞ্জ কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করেন। তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি পেতে ১০ হাজার টাকার তহবিল দেখানো বাধ্যতামূলক ছিল। আর্থিক সংকটে কলেজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে জেলার বিত্তবানরা এগিয়ে না এলেও কলেজ কমিটির সদস্য গিরীন্দ্র নন্দন চৌধুরী ও নদীয়া চন্দ্র দাস পুরকায়স্থের অনুরোধে বৃন্দাবন চন্দ্র দাস মায়ের অনুমতি নিয়ে ১০ হাজার টাকা দান করেন। কলেজ পরিচালনার জন্য তিনি নিজের ১৪-১৫ হাল জমিও দান করেন।
তিনি চেয়েছিলেন মায়ের নামে কলেজের নামকরণ হোক। কিন্তু মায়ের ইচ্ছাতেই পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে কলেজের নাম রাখা হয় ‘বৃন্দাবন কলেজ’। কলকাতা রিপন কলেজের দর্শনের অধ্যাপক বিপিন বিহারী দে প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন।
১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। শুরুতে শুধু উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থাকলেও ১৯৩৩ সালে প্রথম ব্যাচ আইএ পরীক্ষা দেয় সিলেট এমসি কলেজ কেন্দ্রে। ৩১ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করলে ১৯৩৪ সাল থেকে এখানেই পরীক্ষা কেন্দ্র চালু হয়। ১৯৩৯-৪০ শিক্ষাবর্ষে বিএ পাস ও ১৯৪০-৪১ শিক্ষাবর্ষে বিএ অনার্স কোর্স চালু হয়।
১৯৭৯ সালের ৭ মে কলেজটি জাতীয়করণ হয়ে ‘বৃন্দাবন সরকারি কলেজ’ নাম ধারণ করে। ১৯৯৮ সালে অনার্স কোর্স পুনরায় চালুর অনুমতি পায়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের সব বিভাগের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, গণিত, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স পড়ানো হয়। ২০০৩ সাল থেকে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে।
একজন শিক্ষানুরাগী দানবীরের মহানুভবতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার ঠিকানা।
এস এম শামীম আহমেদ :
০৯ মে, ২০২৬, 8:49 PM
দরিদ্র কৃষকের সন্তান হয়েও শিক্ষার আলো ছড়াতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন বৃন্দাবন চন্দ্র দাস। তাঁর এককালীন ১০ হাজার টাকা দানেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম থেকে বেঁচে যায় হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বৃন্দাবন সরকারি কলেজ।
বৃন্দাবন চন্দ্র দাস ১৮৫০ সালের ভাদ্র মাসে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বিথঙ্গল গ্রামের বড় আখড়া সংলগ্ন পশ্চিমের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিষ্ণু চন্দ্র দাস ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক, মা মহামায়া দাস। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তৎকালীন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হলেও পেশায় তিনি ছিলেন মিরাশদার, মহাজন, মহালদার ও সফল ব্যবসায়ী। চিত্তরঞ্জন কটন মিলস ও অল ইন্ডিয়া সুগার মিলস লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ভাদ্র মাসে মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র ও দুই কন্যা রেখে যান।
জমিদারি থাকলেও তিনি সাধারণ কৃষকের মতো জীবনযাপন করতেন। গরিবের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম সেবামূলক মনোভাব। অত্যাচারী জমিদার ও ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতার প্রমাণ তাঁর জীবনীতে মেলে। ব্রিটিশ সরকার ‘চৌধুরী’, ‘রায় সাহেব’ ও ‘ব্যাংকার্স’ উপাধি দিলেও তিনি কখনো নিজ নামের সঙ্গে তা যুক্ত করেননি। নিলামে জমিদারদের নিষ্পত্তি জমি কিনে তিনি ৫৬টি তালুকের মালিক হন।
১৯১৩ সালে কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি মনোহর বাজারে বাঁশের ঘর ও ছোট একটি পাকা ঘর নিয়ে ‘হবিগঞ্জ কলেজ’ নামে যাত্রা শুরু করেন। তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি পেতে ১০ হাজার টাকার তহবিল দেখানো বাধ্যতামূলক ছিল। আর্থিক সংকটে কলেজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে জেলার বিত্তবানরা এগিয়ে না এলেও কলেজ কমিটির সদস্য গিরীন্দ্র নন্দন চৌধুরী ও নদীয়া চন্দ্র দাস পুরকায়স্থের অনুরোধে বৃন্দাবন চন্দ্র দাস মায়ের অনুমতি নিয়ে ১০ হাজার টাকা দান করেন। কলেজ পরিচালনার জন্য তিনি নিজের ১৪-১৫ হাল জমিও দান করেন।
তিনি চেয়েছিলেন মায়ের নামে কলেজের নামকরণ হোক। কিন্তু মায়ের ইচ্ছাতেই পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে কলেজের নাম রাখা হয় ‘বৃন্দাবন কলেজ’। কলকাতা রিপন কলেজের দর্শনের অধ্যাপক বিপিন বিহারী দে প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন।
১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। শুরুতে শুধু উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থাকলেও ১৯৩৩ সালে প্রথম ব্যাচ আইএ পরীক্ষা দেয় সিলেট এমসি কলেজ কেন্দ্রে। ৩১ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করলে ১৯৩৪ সাল থেকে এখানেই পরীক্ষা কেন্দ্র চালু হয়। ১৯৩৯-৪০ শিক্ষাবর্ষে বিএ পাস ও ১৯৪০-৪১ শিক্ষাবর্ষে বিএ অনার্স কোর্স চালু হয়।
১৯৭৯ সালের ৭ মে কলেজটি জাতীয়করণ হয়ে ‘বৃন্দাবন সরকারি কলেজ’ নাম ধারণ করে। ১৯৯৮ সালে অনার্স কোর্স পুনরায় চালুর অনুমতি পায়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের সব বিভাগের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, গণিত, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স পড়ানো হয়। ২০০৩ সাল থেকে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে।
একজন শিক্ষানুরাগী দানবীরের মহানুভবতায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার ঠিকানা।